এক কিডনি নিয়েই ৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ২১ বছর পর জানলেন ফাহিম

Pinky Saha Pinky Saha ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৫ AM BST ২৫ বার পঠিত
এক কিডনি নিয়েই ৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ২১ বছর পর জানলেন ফাহিম

collected

৪৫ বছরের জীবনের প্রায় পুরোটাই ক্রিকেটের সঙ্গে কেটেছে ফাহিম মুনতাসিরের। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে ঘরোয়া ক্লাব, প্রথম শ্রেণি, ‘এ’ দল হয়ে খেলেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলেও। তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলা এই সাবেক অফ স্পিনার নিজের অজান্তেই ক্রিকেটের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন শরীরে একটি বড় ঘাটতি নিয়ে।

ফাহিম মুনতাসির, যিনি ক্রিকেটে ‘সুমিত’ নামে পরিচিত, জন্ম থেকেই একটি কিডনি নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শেষ ম্যাচ খেলার ২১ বছর পর, ৪৩ বছর বয়সে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর শরীরে জন্মগতভাবেই একটি কিডনি নেই।

১৯৯৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে প্লেট চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ যুব দলের সদস্য ছিলেন ফাহিম। পরের বছর পান যুব দলের নেতৃত্ব। ১৯৯৮ সালের মার্চে বিসিবি একাদশের হয়ে ভারতের বিপক্ষে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। ১৯৯৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফাহিমের অভিষেক ২০০১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ওই সিরিজে দুটি ওয়ানডে খেলার পর ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন নিজের শেষ ওয়ানডে। ২০০২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের হয়ে তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলেছেন ফাহিম। ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর প্রথম শ্রেণির ম্যাচ ৩৭টি এবং লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ ৩৩টি।

২১ বছর পর জানলেন এক কিডনির কথা

২০২৩ সালে শারীরিক পরীক্ষা করাতে ভারতের দিল্লিতে যান ফাহিম। নিয়মিত পরীক্ষার অংশ হিসেবে করা আলট্রাসাউন্ডের সময় চিকিৎসকের সন্দেহ হয়, তাঁর বাঁ পাশে কোনো কিডনি নেই।

ফাহিম বলেন, আলট্রাসাউন্ডের সময় চিকিৎসক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কখনো কোনো অস্ত্রোপচার হয়েছে কি না। তিনি না বলার পর চিকিৎসক জানান, সম্ভবত জন্মগতভাবেই তাঁর একটি কিডনি রয়েছে। পরবর্তী পরীক্ষাতেও একই বিষয় নিশ্চিত হয়।

চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, এক কিডনি নিয়ে জন্মানো অস্বাভাবিক হলেও এমন ঘটনা বিরলভাবে ঘটে। তবে শরীরে থাকা একমাত্র কিডনিটি সুস্থ রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এক কিডনি নিয়ে কীভাবে খেললেন এত বছর?

মানুষের শরীরে সাধারণত দুটি কিডনি থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় একজন জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়ে জন্মাতে পারে।

একটি কিডনি না থাকলে ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ—এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে ক্রীড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক কিডনির খেলোয়াড়দের সাধারণত সতর্ক থাকতে বলা হয়। কারণ একমাত্র কিডনিতে গুরুতর আঘাত বা ক্ষতি হলে তা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিসিবির প্রধান চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ চৌধুরীও জানিয়েছেন, একটি কিডনি থাকলেই খেলা যাবে না—এমন নয়। তবে একমাত্র কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে এ ধরনের খেলোয়াড়দের সাধারণত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ফাহিমের সতীর্থদের কাছেও তাঁর শারীরিক এই বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ অজানা। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন, খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁরা কখনো বুঝতে পারেননি ফাহিমের একটি কিডনি নেই। তাঁর ভাষায়, ফাহিম অত্যন্ত ফিট খেলোয়াড় ছিলেন এবং ভালো অফ স্পিন করতেন।

সাবেক ওপেনার হান্নান সরকারও জানিয়েছেন, ফাহিমকে কখনো ফিটনেস বা চোটের কারণে দল থেকে বাদ পড়তে দেখেননি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দীর্ঘ স্পেল বোলিং করলেও তাঁর কোনো শারীরিক সমস্যা চোখে পড়েনি।

এখন কেমন আছেন ফাহিম?

ক্রিকেট খেলার সময় কোনো সমস্যা অনুভব না করলেও বর্তমানে নিজের একমাত্র কিডনি নিয়ে জটিলতায় ভুগছেন ফাহিম। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সমস্যা বেড়েছে। ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ডায়ালাইসিস, যা বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন করতে হচ্ছে তাঁকে।

চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। ভারত বা পাকিস্তানে এই চিকিৎসায় আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছেন ফাহিম। তাঁর চিকিৎসায় বিসিবি ও ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানা গেছে।

খেলা ছাড়ার পরও ক্রিকেটের সঙ্গেই আছেন ফাহিম। লেভেল-২ কোচিং কোর্স করা এই সাবেক ক্রিকেটার মোহামেডানের মতো ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ম্যানেজার ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে আসা বিদেশি দলগুলোর লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্য একটি পরামর্শও দিয়েছেন ফাহিম। তাঁর মতে, খেলোয়াড়দের জন্য পেনশনের মতো একটি ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে ক্যারিয়ার শেষে চিকিৎসার মতো প্রয়োজনীয় খরচ নিয়ে তাঁদের সমস্যায় পড়তে না হয়।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: