মার্কিনবিরোধী বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা গড়তে মরিয়া চীন
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় মতবিরোধ বাড়ার মধ্যেই ইউরেশিয়ার শক্তিগুলোকে একই কূটনৈতিক পরিসরে এনে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে চীন। বেইজিংয়ের কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), ব্রিকসসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম। এর লক্ষ্য এমন একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বৈশ্বিক এজেন্ডা নির্ধারণ করতে না পারে।
সম্প্রতি এসসিওর শীর্ষ সম্মেলন ও জি২০ মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠককে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে চীনের নেতৃত্বে এশিয়া ও ইউরেশিয়ার বিভিন্ন শক্তির সমাবেশ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা—দুই আয়োজন যেন দুই ধরনের বিশ্বব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
এসসিওর সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাশিয়া ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক তৎপরতায় দেখা যায়। চীন-রাশিয়া সম্পর্কের গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় বাজারে রাশিয়ার প্রবেশ সীমিত হওয়ায় মস্কো এশিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকছে। অন্যদিকে চীনের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা ও রাশিয়ার বিকল্প বাজারের প্রয়োজন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করছে।
শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চীন-রাশিয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক সংঘাতের চাপের মধ্যে তেহরান এসসিওকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে দেশটি।
এসসিওর সম্মেলনে পুতিনও সংস্থাটিকে বহুমেরু বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এসসিওর সদস্য দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের বসবাস—যা জোটটির বৈশ্বিক গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।
চীনের কৌশলে এসসিওকে শুধু আঞ্চলিক সহযোগিতার সংগঠন হিসেবে নয়, বরং মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বয়ান তৈরির মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের নেতাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বেইজিং বার্তা দিতে চাইছে যে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্র কেবল ওয়াশিংটন নয়; এশিয়া ও ইউরেশিয়ার শক্তিগুলোও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, অতিরিক্ত উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে আপত্তি জানায় বেইজিং। ফলে বৈঠকে সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতিত্বে আলাদা ‘চেয়ারস স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করা হয়।
চীনের বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়েও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। এসব ইস্যুতে মতবিরোধ দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ জি২০-ও এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।
সব মিলিয়ে চীনের কৌশলের সম্ভাব্য বড় প্রভাব হলো বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত বহুমেরুকরণ। ওয়াশিংটন যখন জি২০, কোয়াডসহ বিদ্যমান জোট ও কাঠামোর মাধ্যমে নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে, বেইজিং তখন এসসিও, ব্রিকস এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমন্বয়ে বিকল্প নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করছে।
রাশিয়া ও ইরানের মতো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর বিকল্প বাজার, অর্থায়ন ও জ্বালানি সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। চীন তার বিশাল বাজার, শিল্প সক্ষমতা ও আর্থিক শক্তিকে এসব প্রয়োজনের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারলে ইউরেশিয়ায় একটি শক্তিশালী বিকল্প অর্থনৈতিক বলয় গড়ে উঠতে পারে। আর এর ফলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের পরিবর্তে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের উত্থান আরও দ্রুত হতে পারে।