collected
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে চুক্তির আওতায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এলএনজি আমদানির জন্য চারটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আটটি চুক্তি থাকলেও এ বছর চুক্তি অনুযায়ী ১০৩টি কার্গো আসার কথা থাকলেও প্রথম নয় মাসে এসেছে মাত্র ২১টি।
সরবরাহ ঘাটতি পূরণে বাধ্য হয়ে খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ধরে রাখতে এলএনজির উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনে এলএনজি খাতের তদারকি করে পেট্রোবাংলা। আর এলএনজি আমদানির দায়িত্বে রয়েছে সংস্থাটির অধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত বছর বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে কাতার থেকে। চলতি বছরও কাতার থেকে আরও বেশি এলএনজি আসার কথা ছিল। আটটি চুক্তির মধ্যে ছয়টির মূল উৎসই কাতার।
গত মার্চে কাতারের একটি বড় এলএনজি উৎপাদন ইউনিটে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর থেকেই দেশটি থেকে এলএনজি সরবরাহ কমতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক এলএনজির সরবরাহ কমার পাশাপাশি দামও বেড়েছে।
কাতারের সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা হলেও শিগগিরই দেশটি থেকে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, দীর্ঘমেয়াদি পাঁচটি চুক্তির আওতায় আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ৪৭টি এলএনজি কার্গোর সরবরাহ বাতিল হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহকারীরা এসব কার্গো দিতে অপারগতা জানিয়েছে। ঘাটতি পূরণে এসব এলএনজি খোলাবাজার বা স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হচ্ছে।
নতুন উৎসের সন্ধানে সরকার
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কাতারের সঙ্গেও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
দেশে এলএনজি আমদানির প্রধান উৎস দীর্ঘদিন ধরে কাতার ও ওমান। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে খোলাবাজার থেকেও এলএনজি কেনা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর নিয়মিত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে এলএনজি আমদানির নতুন উৎস তৈরির পাশাপাশি অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে একটি চুক্তি করেছে সরকার। একই সঙ্গে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। স্থলভিত্তিক একটি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য পরামর্শক নিয়োগও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। সর্বোচ্চ সক্ষমতায় এসব টার্মিনাল ব্যবহার করতে বছরে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হয়। আগামী বছর চুক্তির আওতায় ১১৬টি কার্গো আসার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বাড়ছে এলএনজি আমদানির ব্যয়
চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলাবাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সর্বশেষ এলএনজি কার্গো কিনতে প্রতি ইউনিটে ২৮ ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বেশি দামে এলএনজি কেনার কারণে পেট্রোবাংলার আর্থিক ঘাটতিও বাড়ছে। সূত্রের হিসাবে, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোকসান করছে সংস্থাটি। চলতি বাজেটে গ্যাস খাতে ঘাটতি মেটাতে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে।
তবে যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজির দাম বৃদ্ধি এবং চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলাবাজার থেকে বেশি দামে আমদানি করতে হয়েছে। এতে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাসে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত লোকসান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। এ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে সরকারের কাছে চাওয়া হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সর্বশেষ হিসাবে সরবরাহ ছিল ২৩২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস থেকে ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হয়েছে। এলএনজি থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় আপাতত এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের ঘাটতি কমাতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব এখানে তুলনামূলক বেশি পড়ে। তাই কাতারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ থেকে এলএনজি সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানো এবং সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।