ফুটবলে ফিরছে ধানমন্ডি স্পোর্টস
একটি পেশাদার, আধুনিক ও স্বনির্ভর ক্রীড়া ক্লাব হিসেবে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবকে গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হলেও কয়েক মাস পরও সেই উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ৯ মে ক্লাব পরিদর্শনে এসে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ফুটবল, ক্রিকেট ও হকির পাশাপাশি আর্চারি, শুটিং, সাঁতার, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন ও স্কোয়াশ যুক্ত করে ক্লাবটিকে পূর্ণাঙ্গ স্পোর্টস কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
ক্লাব-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও পুনর্গঠনের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বরং মাঠ, একাডেমি, ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কার্যক্রমকে ঘিরে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ধানমন্ডি সোসাইটির ভূমিকা এবং ক্লাব পরিচালনায় বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
ধানমন্ডি মাঠের ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাঠটির তদারকিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাশাপাশি ধানমন্ডি সোসাইটির সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। বর্তমানে সোসাইটির ২০২৫-২০২৭ কমিটিতে নাজমুল ওয়াসিক খান (অলক) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর আগের সম্পৃক্ততার বিষয় সামনে এনে ক্লাব-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মাঠ ও ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় সোসাইটির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ক্লাব-সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অভিজ্ঞ কোচ ও প্রশিক্ষকদের সরিয়ে দেওয়ায় ফুটবল ও ক্রিকেট একাডেমির কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাডেমির ভর্তি ও মাসিক ফি থেকে নিয়মিত আয় হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক লেনদেনের পদ্ধতি নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছে। আগে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হলেও এখন নগদ অর্থ গ্রহণের ঘটনা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কয়েকজনের দাবি, প্রতি মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনিয়ম হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
ক্লাবটির ফুটবল ও ক্রিকেট কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে সাফওয়ান সোবহান ও ইসতিয়াক সাদেকের পৃষ্ঠপোষকতার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ৮ মে ক্লাবের অ্যাডহক কমিটির আহ্বায়ক ইসতিয়াক সাদেক তিন বছরের মধ্যে ক্লাবকে টেকসই করা এবং ডোনেশননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে নিজস্ব আয়ে পরিচালনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এর পরদিন আমিনুল হকও একইভাবে ক্লাবটিকে স্বনির্ভর ও পূর্ণাঙ্গ স্পোর্টস কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়ার কথা বলেন।
তবে ক্লাব-সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরবর্তী সময়ে ইসতিয়াক সাদেকের নেতৃত্বাধীন অ্যাডহক কমিটির ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একটি পক্ষ ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটবল ও ক্রিকেট দল পরিচালনায় বছরে ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে এবং দীর্ঘ সময়ে পৃষ্ঠপোষকদের ব্যয়ের পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
এদিকে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাব। ফলে আসন্ন মৌসুমে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে নতুন মৌসুমের দল পরিচালনা, খেলোয়াড় ধরে রাখা, কোচিং স্টাফ ও বাজেট নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ফুটবলেও ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিল ক্লাবটি। তবে ঘোষণাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর একাডেমি, দক্ষ কোচিং কাঠামো এবং নিজস্ব রাজস্ব ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্লাব-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আরও অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় অপরাধী ও মাদকসেবীদের ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবকে সত্যিকার অর্থে একটি টেকসই ও পেশাদার ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। ক্লাবের আইনগত ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, একাডেমি থেকে কত আয় হচ্ছে, সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং ক্রীড়া উন্নয়নে কতটা পুনঃবিনিয়োগ করা হচ্ছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরই ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করবে।