ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে আবারও সরব হয়েছে আর্জেন্টিনা। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই দ্বীপগুলোর ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে ফকল্যান্ডের আশপাশের সমুদ্রসীমায় তেল উত্তোলনে যুক্ত বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের বিরোধ নতুন নয়। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জ দখলের চেষ্টা করলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় দুই মাসের সংঘর্ষের পর ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়। এরপর থেকে দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তবে পরাজয়ের চার দশকেরও বেশি সময় পরও ফকল্যান্ডের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি থেকে সরে যায়নি বুয়েনস এইরেস।
সাম্প্রতিক সময়ে এই পুরোনো বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ফকল্যান্ডের আশপাশে তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনার কারণে। বিশেষ করে ‘সি লায়ন’ তেলক্ষেত্রকে ঘিরে তেল উত্তোলনের উদ্যোগ আর্জেন্টিনার আপত্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। দেশটি দাবি করছে, বিতর্কিত ভূখণ্ডের আশপাশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু মন্তব্যও বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফকল্যান্ডের ওপর যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে তা আর্জেন্টিনার জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ওয়াশিংটনের নীতিতে বাস্তব কোনো পরিবর্তন হলে সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফকল্যান্ড ইস্যুতে ইসরাইলের নামও সামনে এসেছে। দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি কোম্পানিতে ইসরাইলের নাভিতাস পেট্রোলিয়ামের উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আর্জেন্টিনা এই কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে।
তবে ইতিহাসের একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়ও রয়েছে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল গোপনে আর্জেন্টিনার কাছে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র সরবরাহ করেছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলের একটি কোম্পানির ফকল্যান্ডের তেল প্রকল্পে সম্পৃক্ততা বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ বসবাস করেন এবং জনসংখ্যার বড় অংশ ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। ১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপপুঞ্জটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
১৯৮২ সালের যুদ্ধের পরও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯৯ শতাংশের বেশি ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেন। আর্জেন্টিনা অবশ্য ওই গণভোটকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবির চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে স্বীকার করে না।
ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা—সব মিলিয়ে ফকল্যান্ড ইস্যু আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে। আর্জেন্টিনা কতটা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং যুক্তরাজ্য ও তার মিত্ররা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।