কর্ণাটকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ প্রায় ১ কোটি নাম, একজনও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর সন্ধান নেই

Pinky Saha Pinky Saha ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ২:০৬ PM BST ১ বার পঠিত
কর্ণাটকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ প্রায় ১ কোটি নাম, একজনও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর সন্ধান নেই

Photo Collected

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় কংগ্রেসশাসিত রাজ্য কর্ণাটকের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বিজেপির বহুল আলোচিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্ব নিয়ে। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার পর রাজ্যটিতে আগের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৯৯ লাখের বেশি ভোটারের নাম। অথচ বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে একজনও বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা।

মঙ্গলবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর কর্ণাটকের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা ভি আনবুকুমারকে প্রশ্ন করা হয়, বাদ যাওয়া প্রায় ১ কোটি ভোটারের মধ্যে কতজন বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। জবাবে তিনি জানান, সংখ্যাটি এক হাজারেরও কম। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসআইআরের পর যাঁদের বিদেশি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই নেপালের নাগরিক। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও আরও কয়েকটি দেশের নাগরিক রয়েছেন, যাঁরা মূলত ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। তবে ওই তালিকায় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন কি না, তা জানাতে পারেননি রাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তা।

ভারতের ২৪টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর কার্যক্রম চললেও এই প্রক্রিয়ায় কতজন বাংলাদেশি নাগরিক শনাক্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন। বিরোধীরা বারবার এ বিষয়ে তথ্য চাইলেও কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রচার চালালেও এসআইআরের মাধ্যমে ঠিক কতজন বাংলাদেশিকে শনাক্ত করা হয়েছে, সেই হিসাব প্রকাশ্যে আসেনি।

‘ঘুসপেটিয়া’ ইস্যুতে বিজেপির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। বিহার, আসাম, ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যেও এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এসব রাজ্যে অনুপ্রবেশের বিষয়টি বিজেপির রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে থাকলেও সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে কতজন বাংলাদেশি নাগরিকের নাম বাদ গেছে, সে বিষয়ে দলটির শীর্ষ নেতারাও নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

এদিকে এসআইআরকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনও চলছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’সহ বিভিন্ন পক্ষ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি এসব অভিযোগের জবাবে দাবি করছে, কংগ্রেস ও তার সহযোগীরা অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় রাখতে চায়, যাতে তাদের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সম্প্রতি এক জনসভায় অভিযোগ করেন, কংগ্রেস ও তার সহযোগীরা অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় রাখার স্বার্থেই এসআইআরের বিরোধিতা করছে। তাঁর বক্তব্য, অনুপ্রবেশকারীরা কংগ্রেসের ভোটব্যাংক। তবে কর্ণাটকের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরও বাংলাদেশি নাগরিক শনাক্তের কোনো নির্দিষ্ট তথ্য সামনে না আসায় বিজেপির এই রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

কর্ণাটকে এসআইআরের আগে ভোটারের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৫৪ লাখ ৩২ হাজার ৩১৪। সংশোধনের পর চূড়ান্ত তালিকায় ভোটারের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৫৫ লাখে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মোট ৯৯ লাখ ৩২ হাজার ৩০৩ জনের নাম বাদ পড়েছে। আগের তালিকার তুলনায় ভোটার কমেছে ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। এই হারে ভোটার কমার দিক থেকে কর্ণাটক ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। প্রথম স্থানে থাকা অরুণাচল প্রদেশে ভোটার কমেছে ২২ শতাংশ। গুজরাট ও উত্তর প্রদেশে কমেছে ১৩ শতাংশ করে এবং ছত্তিশগড়ে কমেছে ১২ শতাংশ।

কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, কর্ণাটকে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬৪ জনকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একাধিক কেন্দ্রে নাম থাকা ভোটারের সংখ্যা ৭ লাখ ৯ হাজার ৮৭০। সবচেয়ে বড় অংশটি ‘স্থানান্তরিত’ ভোটারের, যাঁদের সংখ্যা ৬৫ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭৯। এ ছাড়া ১৯ লাখ ৯২৬ জনকে অনুপস্থিত ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ভোটার তালিকা থেকে এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার কারণ এবং সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি মূলত ‘স্থানান্তরিত’ ও ‘অনুপস্থিত’ ভোটারদের সংখ্যা ঘিরে। তাদের প্রশ্ন, স্থানান্তরিত ভোটারদের অনেকেই যদি ভারতের অন্য কোনো রাজ্যে বসবাস শুরু করে থাকেন, তাহলে তাঁদের নাম বাদ পড়ার ফলে দেশের মোট ভোটারসংখ্যা এতটা কমে যাওয়ার ব্যাখ্যা কী? পাশাপাশি, সন্দেহভাজন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ‘ফর্ম ৭’ ব্যবহারের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু ও বিজেপিবিরোধী ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কর্ণাটকের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১ কোটি নাম বাদ পড়া এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী শনাক্তের তথ্য প্রকাশ না হওয়া ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা ও এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: