collected
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের পদ্মা অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ায় কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ও চর এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এতে নদীতীরবর্তী চরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
কুষ্টিয়ায় ৪০ গ্রাম প্লাবিত
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার নদীবেষ্টিত রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পানি ঢুকে পড়েছে বসতভিটা, সড়ক ও ফসলি জমিতে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব জমিতে থাকা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি আরও বাড়লে কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চরাঞ্চলের বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদ ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারুক আহমেদ জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ রেখেছেন। তবে সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে বিদ্যালয় ভবনগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, উজানের ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পদ্মার পানি বেড়েছে। দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারীর নিম্নাঞ্চল প্রতিবছরই প্লাবিত হয়। পরিস্থিতি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন পর্যবেক্ষণ করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, প্লাবিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
চাঁপাইনবাবগঞ্জেও পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় জেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সদর উপজেলার শাহজাহানপুর, আলাটুলি ও নারায়ণপুর ইউনিয়ন এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাঙ্কা, উজিরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের অনেক জায়গায় পানি ঢুকে পড়েছে।
এতে হাজারো মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। অনেক বাসিন্দা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৬২ হেক্টর জমির আমন ও আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ এবং বিভিন্ন সবজি পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলমগ্ন হওয়ায় সেখানে সাময়িকভাবে ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিব জানান, জেলার পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি আরও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে কোনো নদীর পানিই বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা নেই বলে তিনি জানান।
রাজশাহীর চরাঞ্চলেও পানি ঢুকেছে
রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৯টায় রাজশাহী পয়েন্টে পানির উচ্চতা ১৭ দশমিক ২০ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে।
পানি বাড়তে থাকায় পদ্মার দক্ষিণ পাড়ের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভারত সীমান্তঘেঁষা এসব চরাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।
পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণ ও মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, পদ্মার পানি বাড়লেও রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধ নিয়ে এখনো কোনো ঝুঁকি নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং পরিস্থিতির অবনতি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, যেসব এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন, সেখানে জরুরি ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে খাবারও বিতরণ করা হচ্ছে।
পদ্মার পানি আরও বাড়লে তিন জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।