Photo Collected
মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি আরও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার পৃথিবীর কক্ষপথের গণ্ডি ছাড়িয়ে চাঁদের আশপাশের মহাকাশেও সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা তৈরির কথা জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। তাঁদের বক্তব্যে ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনায় চাঁদের আশপাশের অঞ্চল বা ‘সিসলুনার স্পেস’-এর গুরুত্ব বাড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বুধবার ওয়াশিংটনের বাইরে আয়োজিত এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। তিনি বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এমনভাবে প্রস্তুত হতে হবে, যাতে সমুদ্রের তলদেশ থেকে শুরু করে মহাকাশ ও চাঁদের আশপাশের অঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবেশে লড়াই, টিকে থাকা এবং প্রয়োজন হলে জয়ী হওয়ার সক্ষমতা থাকে।
কেইনের বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের কমব্যাট ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল গ্রেগরি গ্যাগননও চাঁদের আশপাশের এলাকায় সামরিক সক্ষমতা তৈরির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্পেস ফোর্স মহাকাশ ও চাঁদের আশপাশের এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গ্যাগননের বক্তব্য অনুযায়ী, মানবজাতি ধীরে ধীরে মহাকাশের আরও গভীরে প্রবেশ করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় ওই নতুন পরিবেশেও প্রস্তুত থাকা স্পেস ফোর্সের দায়িত্বের অংশ। তিনি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন হলো—সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা ভবিষ্যতে সংঘাতকে মহাকাশ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।
চীনকে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করে গ্যাগনন বলেন, দেশটি মহাকাশ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশে সক্রিয়ভাবে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে মহাকাশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর কয়েক দিন আগেই মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রকাশ্যে জানায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বিমানবাহিনীর মন্ত্রী ট্রয় মেইংক জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কক্ষপথে ‘স্পেস কন্ট্রোল উইপন’ মোতায়েন করেছে। তবে এসব অস্ত্রের ধরন, অবস্থান কিংবা সুনির্দিষ্ট ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ওয়াশিংটনের এই ঘোষণার সমালোচনা করেছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, চীন সব সময় মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে। মহাকাশে অস্ত্রায়ন, সামরিকীকরণ ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’-তে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ স্বাক্ষর করেছে। ওই চুক্তিতে চাঁদসহ মহাজাগতিক বস্তু শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে চুক্তিতে মহাকাশে প্রচলিত সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ওপর একই ধরনের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে চাঁদের আশপাশে সামরিক অভিযান বা প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের কোন সীমা প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে স্পেস ফোর্সের সদস্যসংখ্যাও বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। গ্যাগনন জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে বাহিনীটির সদস্যসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে ২৫ হাজারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অতিরিক্ত সদস্যদের বড় একটি অংশ কমব্যাট ফোর্সেস কমান্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনসহ কয়েকটি দেশ পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংসের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। তবে চাঁদের আশপাশের অঞ্চলকে সম্ভাব্য সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হিসেবে প্রকাশ্যে তুলে ধরা সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো মহাকাশের সামরিক প্রতিযোগিতাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে আসতে পারে কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়। একই সঙ্গে মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও সামরিক কর্মকাণ্ডের সীমা নির্ধারণে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কাঠামো কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।