Photo Collected
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অচলাবস্থার মধ্যেই সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) আসন্ন সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। আগামী ২০ ও ২১ নভেম্বর ভারতের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হবে এসসিওর ‘সভ্যতাগত সংলাপ’ সম্মেলন। এতে অংশ নেওয়ার জন্য পাকিস্তানের জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আওরঙ্গজেব খান খিচিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাকিস্তান এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে দুই দেশের সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে তা হবে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
২০২৫ সালের মে মাসে জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে। এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কোনো মন্ত্রীর ভারতে সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে। এর আগে ২০২৩ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলওয়াল ভুট্টো গোয়ায় অনুষ্ঠিত এসসিওর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।
ভারতীয় সরকারি সূত্র জানিয়েছে, নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক পুরানা কেল্লায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ষোড়শ শতকে মোগল সম্রাট হুমায়ুনের তৈরি এই স্থাপনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এসসিওর সব সদস্যদেশকেই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ভারতের বক্তব্য, এসসিও একটি বহুপক্ষীয় সংগঠন হওয়ায় এর সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন দিয়ে বিবেচনা করা উচিত নয়।
পাকিস্তান সম্মেলনে যোগ দিতে পারে বলে ধারণা করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। গত সেপ্টেম্বরে এসসিওর জাতীয় সমন্বয়ক অলোক ডিমরিকে ইসলামাবাদে পাঠিয়েছিল নয়াদিল্লি। গত দুই বছরের মধ্যে সেটিই ছিল ভারত সরকারের কোনো সরকারি প্রতিনিধির প্রথম আনুষ্ঠানিক পাকিস্তান সফর। আগামী বছর এসসিওর সভাপতিত্ব করবে পাকিস্তান। সেই প্রেক্ষাপটে ডিমরির সফরে দুই দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ও বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁর সফর শেষে আওরঙ্গজেব খান খিচিকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে পাকিস্তান কাকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বহুপক্ষীয় মঞ্চে দুই দেশের অংশগ্রহণের উদ্যোগ থাকলেও ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। এখনো দুই দেশ একে অপরের রাজধানীতে হাইকমিশনার নিয়োগ করেনি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি তুলে ধরছে। গত সেপ্টেম্বরে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে এসসিওর ২৬তম শীর্ষ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দ্বিচারিতার কোনো জায়গা নেই। সন্ত্রাসবাদকে বৈদেশিক নীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা অর্থ, আশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে সহায়তা করার বিরুদ্ধেও তিনি অবস্থান জানান।
অন্যদিকে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মঞ্চে ভারতের কাশ্মীর নীতির সমালোচনা করে আসছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অভিযোগ ও কূটনৈতিক চাপানউতোর অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেও বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতকে পিছিয়ে থাকতে দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এসসিও কাউন্সিলের বৈঠকে যোগ দিতে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তবে সেই সফরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়নি।
১৯৯৬ সালের এপ্রিলে চীনের সাংহাইয়ে চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানকে নিয়ে ‘এসসিও ফাইভ’ গঠনের মধ্য দিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সামরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা ছিল এর লক্ষ্য। ২০০১ সালে উজবেকিস্তান যোগ দেওয়ার পর সংগঠনটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও কার্যক্রম বিস্তৃত করে। ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান সদস্য হয়। পরে ২০২৩ সালে ইরান এবং ২০২৪ সালে বেলারুশ যোগ দেওয়ায় এসসিওর সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০টি দেশে।
ভারতে ‘সভ্যতাগত সংলাপ’ সম্মেলনের আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই। ২০২৫ সালে চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে তিনি প্রাচীন সভ্যতা, ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, এশিয়া ও ইউরেশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একে অন্যকে বোঝার সুযোগ তৈরি হলে সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়বে। আগামী বছর এসসিওর সভাপতিত্ব ও শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবে পাকিস্তান। এখন দেখার বিষয়, নয়াদিল্লির আমন্ত্রণে ইসলামাবাদ সাড়া দেয় কি না এবং এই বহুপক্ষীয় উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি না।