ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন কত দ্রুত এগোনো উচিত এবং ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না—এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এআই খাতের শীর্ষ কয়েকজন উদ্যোক্তা ও গবেষক যেখানে নিরাপত্তার জন্য উন্নয়নের গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন, সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ প্রযুক্তি খাতের একাংশের অবস্থান হলো—গতি কমালে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন অ্যানথ্রোপিকের সিইও ডারিও অ্যামোডেই। সম্প্রতি তিনি ‘উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার’ শিরোনামের একটি দীর্ঘ নিবন্ধে এআই মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমানোর আহ্বান জানান। তাঁর যুক্তি, এআই এখন এমন দ্রুত এগোচ্ছে যে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও মানুষের প্রযুক্তি বোঝার সক্ষমতা একই গতিতে এগোতে পারছে না। বিশেষ করে রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট বা এআইয়ের নিজস্ব সক্ষমতা ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী এআই তৈরির সম্ভাবনাকে তিনি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
অ্যামোডেইর মতে, ভবিষ্যতে এআই যদি নিজেই নিজের পরবর্তী প্রজন্মের আরও শক্তিশালী মডেল তৈরিতে সক্ষম হয়, তাহলে মানুষের পক্ষে এর আচরণ বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, অত্যন্ত শক্তিশালী ও পর্যাপ্তভাবে নিয়ন্ত্রণহীন এআই সাইবার হামলা, জীবাণু অস্ত্র তৈরির মতো বিপজ্জনক কাজে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি—বর্তমান এআই ইতিমধ্যেই এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে এসব বিপর্যয় ঘটবে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
অ্যামোডেইর এই সতর্কবার্তার পর ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং ইলন মাস্কও এআই উন্নয়নের গতি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও তিনজনের বক্তব্যে একটি বিষয়ে মিল দেখা গেছে—এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা পরীক্ষাও আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সনের চাকরি ছাড়ার ঘটনাও এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি অভিযোগ করেন, শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এমন প্রযুক্তির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতে নিজেই নিজেকে উন্নত করতে পারে। তাঁর পদত্যাগের পর এআই নিরাপত্তা নিয়ে শিল্পখাতের ভেতরের উদ্বেগ প্রকাশ্যে আরও জোরালো হয়।
তবে এই অবস্থানের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়নের গতি কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। তাঁর দৃষ্টিতে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ প্রযুক্তি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সম্প্রতি ট্রাম্প এআই নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের আহ্বানকে প্রকাশ্যে খারিজ করেছেন।
এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংও নতুন বাধ্যতামূলক আইন বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেননি। তাঁর যুক্তি, এআই খাতে উদ্ভাবনের গতি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ এবং বেসরকারি খাতের প্রণোদনাও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, কেবল কোম্পানিগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
চীনকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই এই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করে, এআই উন্নয়নে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করলে চীন দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এআই নিরাপত্তার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থা পিছিয়ে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এআই নিরাপত্তায় বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তবে মার্কিন নীতিতে বিষয়টি পুরোপুরি ‘নিয়ন্ত্রণ বনাম উন্নয়ন’—এমন সরল অবস্থায় নেই। ২০২৬ সালের জুনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন একটি নির্বাহী আদেশে উন্নত বা ‘কভার্ড ফ্রন্টিয়ার’ এআই মডেলের ক্ষেত্রে একটি স্বেচ্ছামূলক কাঠামো তৈরির সুযোগ রেখেছে। এর আওতায় কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে মডেল বাজারে ছাড়ার আগে সরকারকে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত সেটি পর্যালোচনার সুযোগ দিতে পারে। একই আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে, এর মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সরকারি লাইসেন্স বা প্রি-ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা তৈরির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বাস্তব কারণ হিসেবেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। এআই এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশের ঘটনা এবং মানুষের প্রত্যাশার বাইরে স্বয়ংক্রিয় আচরণ প্রযুক্তিটির ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে। এসব ঘটনাকে ঘিরেই এআই মডেল প্রকাশের আগে স্বাধীন মূল্যায়ন এবং তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা পরীক্ষার প্রস্তাব সামনে এসেছে।
ফলে এআই নিয়ে বর্তমান বিতর্ক কেবল প্রযুক্তির গতি কমানো বা বাড়ানোর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা পরীক্ষা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতের স্বনিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা। এআই কত দ্রুত এগোবে এবং সেই উন্নয়নের সীমা কে নির্ধারণ করবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আলোচনা আরও তীব্র হচ্ছে।