ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কানাডাকে জোটের প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ বা ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন।
বুধবার ফ্রান্সে দেওয়া এক ভাষণে এ প্রস্তাব তুলে ধরেন ভন ডার লিয়েন। এ সময় তার পাশে ছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ভন ডার লিয়েন বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করা জরুরি। সেই লক্ষ্যেই কানাডার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় কানাডা ইইউর পূর্ণাঙ্গ সদস্য হবে না। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উত্তর আমেরিকার দেশটির পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্য হওয়া সম্ভব নয়। তবে বিশেষ সহযোগী সদস্য হিসেবে কানাডার সঙ্গে ইইউর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হবে বাণিজ্য। কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য আরও জোরদার করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রযুক্তি অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কানাডাকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কানাডা থেকে গ্যাস এবং ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহের বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
জরুরি খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে এসব খনিজের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। ফলে কানাডার প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ইউরোপের প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় তৈরির সুযোগ দেখছে দুই পক্ষ।
প্রস্তাবিত জোটের আওতায় কানাডীয় নাগরিকদের ইউরোপে চলাচল ও বসবাসের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি সম্ভাব্য এই সহযোগিতাকে একটি ‘অনন্য জোট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কানাডার অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই ইউরোপের সঙ্গে অটোয়ার এই ঘনিষ্ঠতার উদ্যোগ সামনে এলো। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার কথা বলেছিলেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এদিকে কানাডাকে ইইউর সহযোগী সদস্য করার প্রস্তাবের খবর প্রকাশের পরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি সম্ভাব্য এই উদ্যোগকে ‘হাস্যকর’ এবং ‘শত্রুতাপূর্ণ’ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইইউ-কানাডা সহযোগিতার উদ্দেশ্য যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর আরও কঠোর শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। অর্থাৎ কানাডা ও ইইউর নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক ওয়াশিংটন-ব্রাসেলস বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে আগে থেকেই মতবিরোধ রয়েছে। একই সময়ে কানাডার সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন চলছে। ফলে কানাডা-ইইউ সম্পর্ক আরও গভীর হলে এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে কানাডাকে ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব এখনো একটি উদ্যোগের পর্যায়েই রয়েছে। এর বিস্তারিত কাঠামো, সহযোগিতার পরিধি এবং সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে কানাডা ও ইউরোপের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।
একদিকে ইউরোপ যখন অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে নিজেদের অংশীদারদের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের উদ্যোগকে কীভাবে দেখছে—তা আগামী দিনের কানাডা-ইইউ সম্পর্কের পাশাপাশি ওয়াশিংটন-ব্রাসেলস সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।