ব্রিটিশ অভিনেত্রী ফ্লোরেন্স পিউ।ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যৌন নিপীড়নের একটি অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী ফ্লোরেন্স পিউ। দীর্ঘ এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, এমন ঘটনায় শুধু নারীরাই নয়, পুরুষদেরও আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর ঘটনায় নীরব থাকার সংস্কৃতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঘটনাটি। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি অনুষ্ঠানে সাতজন পুরুষ তাঁকে ধর্ষণ ও মাদক প্রয়োগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে করা একটি মামলার সূত্রে অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসে।
‘জেন ডো’ ছদ্মনামে পরিচিত ওই শিক্ষার্থী তখন ২০ বছর বয়সী ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে সুরক্ষা দিতে এবং কথিত নিপীড়ন ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যথাযথ পদক্ষেপ নেননি। এ ঘটনায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট ভ্রাতৃসংঘের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
অভিযোগকারীর আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্তের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনকে বহিষ্কার করে। অন্যদের সাময়িক বরখাস্ত করা, কর্মশালায় অংশ নেওয়া কিংবা প্রবন্ধ লেখার মতো শাস্তি দেওয়া হয়। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
‘আমাদের জন্য ক্ষুব্ধ হও’
ঘটনাটি নিয়ে ইনস্টাগ্রামে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান ফ্লোরেন্স পিউ। ওই পোস্টে তিনি বলেন, তরুণীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পড়ে তাঁর অস্বস্তি, অসুস্থতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনাটিকে ভয়াবহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন ঘটনা অতীতেও ঘটেছে এবং এখনো ঘটছে—এই বিষয়টিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি বিচলিত করেছে।
পিউয়ের বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল পুরুষদের ভূমিকা। তাঁর মতে, যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনায় পুরুষদেরও নারীদের মতো আতঙ্কিত ও বীতশ্রদ্ধ হওয়া উচিত। এ ধরনের আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং নীরব থাকার সংস্কৃতি বদলের আলোচনায় পুরুষদেরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
পিউ প্রশ্ন তোলেন, এমন ঘটনায় অনেক পুরুষ নীরব থাকলে কীভাবে বিশ্বাস করা যাবে যে সব পুরুষ এমন নয়। একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, ধর্ষণের মতো ঘটনা কি হঠাৎ ঘটে যেতে পারে, নাকি এর পেছনে আগে থেকেই কোনো পরিকল্পনা ছিল। কেউ যদি আগে থেকে এমন কিছু ঘটতে পারে বলে জানেন এবং তা ঠেকানোর চেষ্টা না করেন, তাহলে তাঁদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তিমূলক ব্যবস্থারও সমালোচনা করেছেন পিউ। তাঁর মতে, ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমা চেয়ে লিখিত বক্তব্য দেওয়া যথেষ্ট নয়। মানুষের জীবন ও মর্যাদার ওপর গুরুতর আঘাতের অভিযোগ উঠলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে নিজের কঠোর অবস্থান জানিয়ে পিউ প্রশ্ন তোলেন, এমন গুরুতর অভিযোগের মুখে পড়া ব্যক্তিদের আগের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার সুযোগ থাকা উচিত কি না। একই সঙ্গে ঘটনার প্রতিবাদ করা এবং অভিযোগকারীর পাশে দাঁড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানান তিনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক সময় এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে, পুরুষেরা গুরুতর ক্ষতি করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের বড় কোনো পরিণতি ভোগ করতে হবে না।
পিউয়ের মতে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি কোনো পুরুষের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব ভুক্তভোগীর ওপরও বিবেচনা করা উচিত। কারণ, এতে একজন নারীর মনে হতে পারে, তাঁর অভিজ্ঞতা ও বক্তব্যের চেয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সুনামকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যারা রক্ষা করেন কিংবা তুলনামূলক হালকা শাস্তির ব্যবস্থা করেন, তাঁদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানান পিউ।
‘নারীর নিরাপত্তা ছাড়া সমতা নয়’
বিবৃতির শেষ দিকে নারী-পুরুষের সমতার সঙ্গে নারীর নিরাপত্তার সম্পর্কের কথা বলেন পিউ। তাঁর মতে, নারীর শরীর ও নিরাপত্তার প্রতি যথাযথ সম্মান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
নারীরা যেন নিরাপদ বোধ করেন এবং নিজেদের জীবন স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে পারেন, সেটিই সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে পুরুষদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান অভিনেত্রী।
পোস্টটি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর আরেকটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে পিউ দাবি করেন, তাঁর মূল পোস্টটি অনেকের কাছে দেখা যাচ্ছিল না। নিজের এবং কয়েকজন অনুসারীর পোস্টটি দেখতে সমস্যা হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ধর্ষণ নিয়ে কথা বলার কারণেই কি তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেন্সর করা হচ্ছে? পরে অবশ্য পোস্টটি আবার সবার কাছে দৃশ্যমান হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের বিষয়ে এর আগেও প্রকাশ্যে কথা বলেছেন ফ্লোরেন্স পিউ।