Photo Collected
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধ তিন বছরে উপত্যকাটির চেহারা বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলের টানা বিমান ও স্থল হামলায় বিস্তীর্ণ এলাকা, আবাসিক ভবন, অবকাঠামো ও জরুরি পরিষেবা ধ্বংস হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও গাজাবাসীর দুর্ভোগ শেষ হয়নি; যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
যুদ্ধের প্রভাবে গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা আমূল বদলে গেছে। বহু পরিবার বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রীর প্রয়োজন ছিল। পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও স্যানিটেশনের সংকটের কারণে দৈনন্দিন জীবনও কঠিন হয়ে উঠেছে। পানি সংগ্রহ, রান্না কিংবা যোগাযোগের মতো সাধারণ কাজের জন্যও এখন বাড়তি সময় ও সম্পদের প্রয়োজন হচ্ছে।
যুদ্ধ গাজার অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং বেকারত্ব বেড়ে ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি কমে দাঁড়িয়েছে ২১২ ডলারে, যা ২০২২ সালে ছিল ১ হাজার ২৫৩ ডলার। আয় ও কর্মসংস্থান হারিয়ে বহু পরিবার এখন মানবিক সহায়তা, ঋণ ও ছোটখাটো অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। ইউনিসেফের হিসাবে, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় সাত লাখ শিশু টানা প্রায় তিন বছর সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের সব কটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে মাত্র ১৯টি কোনো না কোনোভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির সংকটে জরুরি চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে গাজার মানুষের বসবাসের পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশে বিধিনিষেধ বিস্তৃত ছিল। ফলে ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি উপত্যকার ৩০ শতাংশেরও কম এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছেন। যুদ্ধের পাশাপাশি দুর্বল হয়ে পড়েছে বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। তিন বছর পরও গাজার মানুষের সামনে তাই পুনর্বাসন, মৌলিক পরিষেবা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ অনিশ্চিত রয়ে গেছে।