ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মঞ্চে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে আবারও সরব হয়েছে ভারত। দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি হরিশ পারভাথানেনি বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সন্ত্রাসী নেতাদের অনেকেই কোনো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন না; বরং সাধারণ মানুষের বসতিপূর্ণ এলাকাতেই দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন।
সেপ্টেম্বর ১১-এর হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেওয়া বক্তব্যে হরিশ ৯/১১ হামলার সঙ্গে জড়িত আল-কায়দার শীর্ষ নেতাদের উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন, ওসামা বিন লাদেন, খালিদ শেখ মোহাম্মদসহ হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেই শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হন।
হরিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে একটি সুরক্ষিত কম্পাউন্ডে অবস্থানরত ওসামা বিন লাদেন মার্কিন অভিযানে নিহত হন। অন্যদিকে ৯/১১ হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদকে ২০০৩ সালে রাওয়ালপিন্ডি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রামজি বিনালশিব ও ওয়ালিদ বিন আতাশও পাকিস্তানের বিভিন্ন শহর থেকে আটক হয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই উদাহরণ তুলে ধরে ভারতীয় প্রতিনিধি বলেন, ৯/১১ হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ‘গুহা বা দুর্গম সীমান্ত এলাকায়’ লুকিয়ে ছিলেন না। বরং তারা দীর্ঘ সময় লোকালয়ে অবস্থান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। হরিশের অভিযোগ, এ ধরনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া পরিবেশের অবসান ঘটানো জরুরি।
লস্কর-ই-তৈবা ও জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন হরিশ। তাঁর অভিযোগ, ৯/১১-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার যে ‘সহায়ক পরিবেশ’ অতীতে ছিল, একই ধরনের পরিবেশ পরবর্তী সময়ে এসব গোষ্ঠীকেও জায়গা, সহায়তা ও দায়মুক্তি দিয়েছে। এসব গোষ্ঠী পরিচয় বা নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কাঠামো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা তালিকাতেও লস্কর-ই-তৈবাকে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সংগঠনটির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে।
হরিশ পারভাথানেনি বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ আশ্রয় শুধু একটি দেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে নতুন করে হামলা চালাতে না পারে, সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ভারতের প্রতিনিধি আরও বলেন, সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি যারা তাদের সহায়তা, অর্থায়ন, আশ্রয় বা পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ বন্ধ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভারতের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘও সাম্প্রতিক আলোচনায় সন্ত্রাসবাদকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার অন্যতম গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির আলোচনায় নিরাপত্তা পরিষদ সন্ত্রাস মোকাবিলায় জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনা করে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল। ভারতীয় বর্ণনা অনুযায়ী, লস্কর-ই-তৈবা ও জইশ-ই-মোহাম্মদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাও ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল।
জাতিসংঘের মঞ্চে হরিশের বক্তব্যে মূল বার্তা ছিল—সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে শুধু হামলা বা গ্রেপ্তার নয়, তাদের নিরাপদ আশ্রয়, অর্থায়ন ও সহায়তার নেটওয়ার্কও বন্ধ করতে হবে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে কোনো দেশ বা সাধারণ মানুষ যেন সন্ত্রাসী হামলার শিকার না হয়, সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।