দিল্লির শীতকালীন দূষণ ঠেকাতে কড়াকড়ি, বিএস-৬ ছাড়া গাড়িতে মিলবে না জ্বালানি

Pinky Saha Pinky Saha ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ AM BST ৪৭ বার পঠিত
দিল্লির শীতকালীন দূষণ ঠেকাতে কড়াকড়ি, বিএস-৬ ছাড়া গাড়িতে মিলবে না জ্বালানি

Photo Collected

দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের রাজধানী দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় শীতকালীন বায়ুদূষণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিবছর শীতের সময় বায়ুর গুণমানের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় এবার আগেভাগেই দূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

সোমবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী মণিন্দর সিরসা এবং বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কমিশনের (সিএকিউএম) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত যেসব গাড়ি বিএস-৬ নির্গমন মানদণ্ড পূরণ করে না, সেগুলোর রাজধানীতে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এই বিধিনিষেধ ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।

শীতকালীন দূষণের সময় সরকারি ও বেসরকারি অফিসের ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও দিল্লিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে একই ধরনের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

গাড়ির জন্য পিইউসিসি বাধ্যতামূলক

যানবাহনের দূষণ কমাতে ‘পলিউশন আন্ডার কন্ট্রোল সার্টিফিকেট (পিইউসিসি) ছাড়া জ্বালানি নয়’ নামে একটি বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ বৈধ দূষণমুক্ত সনদ না থাকলে গাড়িতে জ্বালানি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বরপ্লেট শনাক্ত করার সুবিধাযুক্ত দিল্লির ৫০০টি জ্বালানি স্টেশনে এই নিয়ম কার্যকর করা হবে। কর্তৃপক্ষের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, গত ১২ মাসে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ৫৫টি বিএস-৩ এবং আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া পুরোনো গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ও জানিয়েছে, নির্ধারিত আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া গাড়িতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে আর জ্বালানি দেওয়া হবে না। পেট্রলচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে নির্ধারিত আয়ু ১৫ বছর এবং ডিজেলচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে ১০ বছর।

তবে এই নিয়ম ঠিক কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

পার্কিং ফি দ্বিগুণ, অফিসের সময়েও পরিবর্তন

দূষণ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় অনুমোদিত পার্কিং এলাকাগুলোতে পার্কিং ফি দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশনের নিজস্ব মালিকানাধীন ও ব্যবস্থাপনায় থাকা পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।

যানজট ও একই সময়ে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমাতে সরকারি অফিসের সময়সূচিও আলাদা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দিল্লির মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের অফিস সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে।

অন্যদিকে দিল্লি সরকারের অফিসগুলো সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চলবে। অফিসের সময় আলাদা করার মাধ্যমে একই সময়ে সড়কে যানবাহনের চাপ কমানোর চেষ্টা করা হবে।

নির্মাণ ও ভাঙার কাজে বড় বিধিনিষেধ

শীতকালীন দূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে ধুলা নিয়ন্ত্রণেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত দিল্লিতে সব ধরনের নির্মাণ ও ভাঙার কাজ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ধুলা তৈরি করে এমন ভাঙার কাজ এবং বাইরের সাধারণ নির্মাণকাজ ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, বায়ুর মান উন্নত করতে নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বা হটস্পট চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা, সমন্বিত প্রয়োগ, নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

রাস্তা সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতায় জোর

দিল্লিতে সড়ক সংস্কারের কাজও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে। গত তিন বছরে দিল্লিতে বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করা হলেও ২০২৬ সালে ৩ হাজার ৬৫ কিলোমিটার রাস্তা নতুন করে সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ১৯৩ কিলোমিটার রাস্তার কাজ শেষ হয়েছে। আরও ১ হাজার ৮৭২ কিলোমিটার রাস্তার কাজ বাকি রয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে সিমেন্ট-কংক্রিটের কাজ এবং ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বিটুমিনের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের উপস্থাপনায় বলা হয়, দিল্লিতে প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এর বিপরীতে বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত করা হয় প্রায় ৭ হাজার ৬৪২ টন।

তবে অক্টোবরের মধ্যে নতুন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা যুক্ত হয়ে দৈনিক মোট সক্ষমতা আরও ৫ হাজার ৯০০ টন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাস্তা পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত যান্ত্রিক পরিচ্ছন্নতা মেশিনের সংখ্যাও ২০২৫ সালের ৭৬ থেকে বাড়িয়ে ৯৮ করা হয়েছে।

শিল্পকারখানায় নজরদারি আরও বাড়বে

শিল্পকারখানা থেকে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে নিয়মকানুন প্রয়োগ আরও জোরদার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বায়ুর মান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যবেক্ষণ স্টেশনের সংখ্যা ৪৭ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয়েছে। পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ৩৩৪টি প্রয়োগকারী দল গঠন করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজার ২৭১টি শিল্পকারখানায় জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত ২ হাজার ২৮৩টি কারখানা বন্ধ বা সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

হটস্পট পর্যবেক্ষণ ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ

নতুন পরিকল্পনায় দিল্লির ঝুঁকিপূর্ণ বা দূষণপ্রবণ এলাকাগুলোতে সাপ্তাহিক পরিদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দূষণের সমস্যা চিহ্নিত করতে নাগরিকদের কাছ থেকে অভিযোগ নেওয়া হবে।

নাগরিকদের পরামর্শ গ্রহণের জন্য একটি নতুন পোর্টাল চালুর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যায় বায়ুমান সূচক বা একিউআইয়ের বুলেটিন প্রকাশ করা হবে।

দিল্লি-এনসিআরের বায়ুদূষণকে শুধু রাজধানী-কেন্দ্রিক না রেখে পুরো বায়ু অঞ্চলের ভিত্তিতে মোকাবিলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য এনসিআরের অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শীতের কয়েক মাস নয়, সারা বছরই পরিবহন, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর মতো দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। ফলে এবারের পরিকল্পনায় শীতকালীন জরুরি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: