হরিয়ানায় প্রেম করে বিয়ে, চার মাস আত্মগোপনে তরুণ দম্পতি

Pinky Saha Pinky Saha ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:১৪ PM BST ২৯ বার পঠিত
হরিয়ানায় প্রেম করে বিয়ে, চার মাস আত্মগোপনে তরুণ দম্পতি

সংগৃহীত ছবি

ভারতের হরিয়ানায় অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে প্রেম করে বিয়ে মানেই নতুন সংসার শুরু নয়। বরং বিয়ের পরই শুরু হয় আত্মগোপনের জীবন। একই গ্রাম বা গোত্রে বিয়ের সামাজিক নিষেধাজ্ঞা, পরিবারের আপত্তি এবং খাপ পঞ্চায়েতের চাপের কারণে অনেক দম্পতিকে রাতের আঁধারে বাড়ি ছাড়তে হয়। কেউ বন্ধুর বাড়িতে, কেউ আত্মীয়ের আশ্রয়ে, আবার কেউ পুলিশের নিরাপত্তায় পরিচালিত সেফ হাউসে দিন কাটান।

হিসার জেলার শ্রবণ ও আরতির গল্পও এমনই। স্কুলজীবন থেকেই তাদের পরিচয়, পরে তা গড়ায় প্রেমে। চলতি বছরের মে মাসে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন দুজন। বয়স তখন শ্রবণের ২১ এবং আরতির ১৯ বছর। নিজেদের গ্রামের মানুষ এই সম্পর্ক সহজে মেনে নেবে না বুঝতে পেরে তারা গোপনে আদালতে গিয়ে বিয়ে করেন।

বিয়ের পর টানা চার মাস আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে তাদের। কখনো বন্ধুর বাড়িতে, কখনো শহরের পার্ক কিংবা শপিং মলে সময় কাটিয়েছেন তারা। শ্রবণের বাবা মাস্তান সিং অবশ্য ছেলের ফোন পেয়ে প্রথমে খুশি হয়েছিলেন। কারণ আরতিকে তাদের পরিবার আগে থেকেই চিনত। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন জানা যায়, আরতির পরিবার এই বিয়ে মেনে নিতে রাজি নয়।

পঞ্চায়েতের ফতোয়া ও সামাজিক বয়কট

পরিবারের আশ্বাসে একপর্যায়ে শ্রবণ ও আরতি গ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু এরপরই শুরু হয় পঞ্চায়েতের তৎপরতা। গত ২০ সেপ্টেম্বর গ্রামের প্রবীণরা একটি অনানুষ্ঠানিক সভা করেন। সেখানে প্রেম করে একই গ্রামের মধ্যে বিয়ের বিরোধিতা করে সামাজিক বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গ্রামের প্রবীণ সদস্য কুলবন্ত গোসলের বক্তব্য, একই জাতি ও একই গ্রামের তরুণ-তরুণীর মধ্যে বিয়ে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন দম্পতিদের সামাজিকভাবে বর্জন করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।

তবে গ্রামের সরপঞ্চ রতন সিং দাবি করেন, এটি সরকারি পঞ্চায়েতের কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং গ্রামের প্রবীণদের ব্যক্তিগত মত। তার ভাষ্য, তারা প্রেমের বিরোধী নন। তবে একই গ্রামের মানুষের মধ্যে বিয়ে হলে গ্রামের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আরতির পরিবারও এই বিয়েকে মেনে নেয়নি। তার দাদি রোশনি বলেন, তারা চেয়েছিলেন আরতি পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করায় এখন তারা তাকে মেনে নিতে পারছেন না।

একই গোত্র বা গ্রামের বাইরে বিয়ের পুরোনো প্রথা

হরিয়ানার বিভিন্ন খাপ পঞ্চায়েতের মধ্যে একই গোত্র, একই গ্রাম কিংবা নির্দিষ্ট সামাজিক সীমানার মধ্যে বিয়ের বিরোধিতা দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রথা। দাহিয়া খাপের সভাপতি সুরেন্দর দাহিয়ার দাবি, তাদের প্রথা অনুযায়ী বিয়ের ক্ষেত্রে গ্রাম, এলাকা ও গোত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন।

তার দাবি, একই উৎসের মানুষের মধ্যে বিয়ে হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু শ্রবণ-আরতি নন, হরিয়ানার বিভিন্ন এলাকায় প্রেম করে বিয়ে করা আরও অনেক দম্পতিকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে ৩৬টি অনার কিলিংয়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হরিয়ানায় ঘটেছে চারটি।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে শুধু সামাজিক রীতি ভাঙার ক্ষোভ নয়; নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কাও ভূমিকা রাখে।

সেফ হাউসেও অনিশ্চিত জীবন

হিসার শহরের কেন্দ্রীয় কারাগারের পেছনে রয়েছে সরকারি অনুমোদিত একটি সুরক্ষা-আবাস বা সেফ হাউস। হুমকির মুখে থাকা কিংবা পরিবারের আপত্তির মধ্যে প্রেম করে বিয়ে করা দম্পতিদের সাময়িকভাবে সেখানে রাখা হয়।

একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি দম্পতি থাকার ব্যবস্থা থাকলেও সুযোগ-সুবিধা সীমিত। অনেক সময় বাসিন্দাদের নিজেদেরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়।

হিমাংশু ও বিমলার অভিজ্ঞতাও এমন। ভিন্ন জাতির এই দম্পতির মধ্যে হিমাংশু বাল্মীকি সম্প্রদায়ের এবং বিমলা সাইনি সম্প্রদায়ের। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিয়ের পর পরিবার ও পঞ্চায়েতের ভয়ে তাদের বাড়ি ছাড়তে হয়। প্রথমে পুলিশের সেফ হাউসে এবং পরে সিরসায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে প্রায় তিন মাস আত্মগোপনে ছিলেন তারা। নিরাপত্তার কারণে মোবাইল ফোনসহ সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

নিরাপত্তা দিতে গিয়ে বিপাকে প্রশাসন

প্রেম করে বিয়ে করা দম্পতিদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে প্রশাসনকেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। জিন্দ ও হানসি জেলার পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব দম্পতির জন্য আলাদা কোনো বাজেট বা স্থায়ী অবকাঠামো নেই। ফলে কখনো পুলিশ লাইনের একটি ছোট ঘরেই তাদের থাকতে হয়।

সব মিলিয়ে, ভালোবাসার সম্পর্ককে বিয়েতে রূপ দেওয়া এসব তরুণ-তরুণীর কাছে নতুন সংসার শুরুর বদলে অনেক সময় শুরু হয় এক অনিশ্চিত জীবন। চাকরি হারানো, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া, সামাজিক বয়কট এবং নিরাপত্তার কারণে সেফ হাউসের চার দেয়ালের মধ্যে দিন কাটানো—প্রেমের বিয়ের পর এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন অনেক দম্পতি।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: