ছবি: সংগৃহীত
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে করা দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার ভিত্তিতে এই প্রত্যাহার হলেও তা বাস্তবায়ন করছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রত্যাহারের সময়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হলো।
মার্কিন সেনা চলে যাওয়াকে ইরান ও দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখছে। ইরানপন্থী ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রত্যাহারকে ইরাকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে ইরাকের ভেতরে এই পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন ধরনের উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে সুন্নি গোত্রীয় নেতা ও কুর্দি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একাংশের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা কাজে লাগাতে পারে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস।
ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য, আকাশ নজরদারি, ড্রোন ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। এসব সক্ষমতা পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো প্রস্তুতি ইরাকের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর রয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইএসের হুমকিও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সংগঠনটির কথিত খেলাফত বহু বছর আগে পরাজিত হলেও ইরাকে তাদের স্লিপার সেল এখনও সক্রিয় রয়েছে বলে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মার্কিন প্রত্যাহারের ঘোষণার পর এসব সেলের তৎপরতা বাড়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী এরই মধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আইএসের সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার একটি পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে। দেশটির কর্মকর্তাদের ধারণা, এর মাধ্যমে আইএস নিজেদের সক্ষমতার জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
ইরাকের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিরোধেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর ইরাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
চলতি বছরের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতেও ইরাকের ভূখণ্ডে হামলার ঘটনা ঘটেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে ছিলেন। জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন সংক্রান্ত ঘটনার সময় এক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট নিহত হন।
অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শেষ হওয়ার পর ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কিছু বিশ্লেষক। তাদের মতে, মার্কিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে ইরানের প্রভাবের একটি পাল্টা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সেই উপস্থিতি না থাকলে বিভিন্ন মিলিশিয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিজেদের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।
তবে ইরাকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মার্কিন বাহিনীর অনুপস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা সক্ষমতা কার্যকরভাবে ধরে রাখা। একদিকে আইএসের স্লিপার সেল, অন্যদিকে ইরানপন্থী শক্তিশালী মিলিশিয়া—এই দুই ধরনের চাপের মধ্যেই দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।