ছবি: সংগৃহীত
শ্রীলঙ্কায় ২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে চালানো ভয়াবহ বোমা হামলার মামলায় ১৫ জনকে ২০০ থেকে ২৬০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার দেওয়া রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় আরও নয়জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে নওফার মৌলভী রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা তাকে হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডেতে শ্রীলঙ্কার তিনটি গির্জা ও তিনটি বিলাসবহুল হোটেলে একযোগে বোমা হামলা চালানো হয়। ভয়াবহ ওই হামলায় ২৭০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। হামলায় অংশ নেওয়া আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা সবাই বিস্ফোরণে নিহত হন।
তদন্তকারীরা হামলার জন্য ইসলামপন্থী চরমপন্থীদের দায়ী করেছিলেন। মামলায় অভিযুক্ত ২৫ জনই শ্রীলঙ্কার মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান।
হামলার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ২৩ হাজারের বেশি অভিযোগ আনা হয়। রায় ঘোষণার দিন তাদের জোড়ায় জোড়ায় হাতকড়া পরিয়ে দুটি প্রিজন বাসে করে আদালতে নেওয়া হয়।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিদেশি নাগরিক ও শিশুরাও
২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইস্টার সানডের হামলাটি দেশটির অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন শ্রীলঙ্কার নাগরিক। তাদের মধ্যে অনেক শিশু ছিল।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন দেশটির জনপ্রিয় শেফ শান্তা মায়াদুন্নে ও তার মেয়ে। হামলায় পাঁচ সদস্যের একটি তরুণ পরিবারও নিহত হয়। এ ছাড়া হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া হোটেলগুলোর অন্তত আটজন কর্মী এবং নেগোম্বো শহরের একই পরিবারের পাঁচ সদস্য প্রাণ হারান।
হামলায় নিহত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ছিলেন ১১ জন ভারতীয়, আটজন ব্রিটিশ ও পাঁচজন মার্কিন নাগরিক। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, চীন, ডেনমার্ক, জাপান, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও তুরস্কের নাগরিকও নিহত হন।
শাংরি-লা হোটেলে হামলার সময় ডেনিশ ধনকুবের অ্যান্ডার্স হোলচ পভলসেনের তিন সন্তানও নিহত হয়েছিলেন। সে সময় পরিবারটি শ্রীলঙ্কায় ছুটি কাটাচ্ছিল।
হামলার পর ওঠে গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগ
ইস্টার সানডের হামলার পর শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। দেশটির কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে গুরুতর গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে।
শ্রীলঙ্কার সংসদে জানানো হয়েছিল, হামলার বিষয়ে ভারত থেকে পাওয়া একটি গোপন সতর্কবার্তা যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়নি।
২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কার সুপ্রিম কোর্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনাকে হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের কয়েক মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার বিষয়টিও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
এরপর গত মাসে হামলার ঘটনায় ফৌজদারি অবহেলার দায়ে দুই সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে শ্রীলঙ্কায় কয়েক দশক ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ায় দেশটিতে এ ধরনের সাজা সাধারণত পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হয়।
সাবেক গোয়েন্দা প্রধানকে ঘিরেও তদন্ত
ইস্টার হামলায় নিহতদের স্বজনদের ন্যায়বিচারের দাবিতে শ্রীলঙ্কায় কয়েক বছর ধরে বিক্ষোভ হয়ে আসছে। এর মধ্যেই দেশটির সাবেক গোয়েন্দা প্রধান সুরেশ সাল্লের বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত চলছে।
তার বিরুদ্ধে ইসলামপন্থী চরমপন্থীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ৪-এর একটি তথ্যচিত্রেও একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
ওই তথ্যচিত্রে কয়েকজন তথ্য ফাঁসকারীর বক্তব্য তুলে ধরে দাবি করা হয়, শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজাপাকসা পরিবারের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে হামলাগুলো ঘটতে দেওয়া হয়েছিল। তবে সুরেশ সাল্লে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসাও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০১৯ সালের হামলার কয়েক মাস পর ইসলামপন্থী চরমপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন গোতাবায়া রাজাপাকসা। বর্তমানে তার দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। চলমান তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেছেন।