ছবি: সংগৃহীত
কলকাতায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে চরম আবাসন সংকটে পড়ছেন বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। শহরের বিভিন্ন এলাকায় হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই থাকার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। চালু থাকা কিছু আবাসনে ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্বল্পবিত্ত রোগীরা।
নেত্রকোনার মহম্মদ রফিকুল সম্প্রতি বড় ভাই সফিকুলের ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান। মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে আগস্টের শেষে কলকাতায় পৌঁছানোর পর একটি গেস্টহাউসে ওঠেন তিনি। হাসপাতালে এক রাত থেকে কেমোথেরাপি নিয়ে ছাড়া পান সফিকুল। আরও কয়েকটি পরীক্ষা থাকায় কয়েক দিন গেস্টহাউসে থাকার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের।
কিন্তু অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরও প্রথম রাতেই গেস্টহাউস ছাড়তে বাধ্য হন তাঁরা। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মালপত্রসহ তাঁদের বের করে দেওয়া হয়। আশপাশে থাকার জায়গা খুঁজেও না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফুটপাতে প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে রাত কাটাতে হয় রোগীসহ পরিবারের সদস্যদের।
রফিকুলের প্রশ্ন, ‘কেন আমাদের সঙ্গে এমন করা হচ্ছে? আমাদের অপরাধ কী?’
শুধু মধ্য কলকাতার চিত্রই নয়, ই এম বাইপাসসংলগ্ন ডি’সান, মণিপাল, পিয়ারলেস, নারায়ণা আর এন টেগোরসহ বিভিন্ন করপোরেট হাসপাতালের আশপাশেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। প্রশাসনিক নির্দেশে বেশ কিছু হোটেল ও গেস্টহাউস সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা আবাসনগুলোর ভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।
গত ১৯ আগস্ট মধ্য কলকাতার মারকুইস স্ট্রিটের একটি বেসরকারি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত সাতজন বাংলাদেশিসহ নয়জন নিহত হওয়ার পর শহরের হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। এরপর কলকাতা পৌরসভা শহরের হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোতে ব্যাপক অভিযান শুরু করে।
অভিযানে ৯৬০টি হোটেল ও গেস্টহাউস পরিদর্শনের পর ৯১৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাময়িক বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, মারকুইস স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও কলিন লেনের মতো এলাকায় ছোট ও বাজেট হোটেলগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। কারণ কলকাতার আলিপুরের মতো অভিজাত এলাকার হোটেলের ভাড়া তুলনামূলক বেশি। ফলে বাংলাদেশি রোগীদের বড় একটি অংশ এত দিন নির্ভর করতেন মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ই এম বাইপাস, গড়িয়া, সন্তোষপুর, মুকুন্দপুর ও পাটুলির মতো এলাকার কম বাজেটের হোটেল ও গেস্টহাউসের ওপর।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর ভবন পুরোনো হওয়ায় অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র পেতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ১০০ থেকে ১৫০ বছরের পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে মূল নকশা ও প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
গেস্টহাউস বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়েছে আশপাশের খাবারের দোকান, ওষুধের ব্যবসা, ফরেন এক্সচেঞ্জ কাউন্টার ও ট্র্যাভেল এজেন্টদের ওপরও। বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ওপর নির্ভরশীল এসব ছোট ব্যবসায় এখন নতুন করে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতার কয়েকটি করপোরেট হাসপাতালও উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশি রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করতে অনুমোদিত কিছু গেস্টহাউসের সঙ্গে চুক্তি করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা রোগীদের আগে থেকেই নিরাপদ আবাসন বুক করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
উডল্যান্ডস হাসপাতালের সিইও রূপক বড়ুয়া জানিয়েছেন, রোগীদের জন্য আলিপুর এলাকার বেশ কিছু নিরাপদ গেস্টহাউস ও হোটেলের তালিকা দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা কলকাতায় আসার আগেই থাকার জায়গা নিশ্চিত করতে পারেন।
একদিকে হোটেল-গেস্টহাউসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের অভিযান, অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য আসা বাংলাদেশি রোগীদের আবাসন সংকট—দুইয়ের মাঝে তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা। নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসনের পদক্ষেপ চললেও দ্রুত সমাধান না হলে কলকাতার চিকিৎসা পর্যটন ও সংশ্লিষ্ট ছোট ব্যবসায় এর প্রভাব পড়তে পারে।