Photo Collected
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুতি এলাকায় এক বাবা ও তাঁর তিন ছেলেকে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এনেছে সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ বা ‘মাসুম’। সংগঠনটির দাবি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই ওই চারজনকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
অভিযুক্ত চারজন হলেন—৬০ বছর বয়সী ডাবলু শেখ এবং তাঁর তিন ছেলে কায়েম শেখ (২৯), রাজাউল শেখ (২০) ও ১৬ বছর বয়সী আসমাউল শেখ। তাঁরা মুর্শিদাবাদের সুতি থানার উমরাপুর পঞ্চায়েতের বালিয়াঘাটি গ্রামের বাসিন্দা।
মাসুমের দাবি, গত ১৩ বা ১৪ আগস্ট রাতে সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা ডাবলু শেখকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান। পরে তাঁর তিন ছেলেকেও পুলিশ হেফাজতে নেয়। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য, ডাবলু শেখ ও তাঁর ছেলে কায়েম শেখ পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় থাকার বিষয়টি স্বাধীনভাবেও যাচাই করেছে সংবাদমাধ্যম Scroll। ডাবলু শেখের বাবা শেখ সামজনির নামও পুরোনো ভোটার তালিকায় থাকার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
পরিবারের হাতে আধার, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ডসহ বিভিন্ন ভারতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে বলেও মাসুমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। সংগঠনটির প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ডাবলু শেখের পরিবারের দীর্ঘদিনের ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবির পক্ষে পুরোনো ভোটার তালিকা ও অন্যান্য নথিও রয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য কী
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারের দাবির সঙ্গে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। Scroll-এর প্রতিবেদনে সুতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবিজিৎ বসু মল্লিক চারজনকেই বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং পরে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ আরও দাবি করেছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের মে মাসের একটি নির্দেশনার আওতায় তাঁদের আটক করা হয়েছিল এবং তাঁদের জঙ্গিপুরের একটি হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছিল।
তবে চারজনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি Scroll। অন্যদিকে পরিবারের পক্ষ থেকেও তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
মাসুম ও Programme Against Custodial Torture and Impunity (PACTI) পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, যদি কোনো আইনসম্মত ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া ছাড়াই চারজনকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে তাঁদের দ্রুত নিরাপদে ভারতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশি অনুসন্ধান প্রতিবেদন, ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (FRRO) নির্দেশপত্র, বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের নথি এবং বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের রেকর্ড প্রকাশের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
সুতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জঙ্গিপুর জেলার পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখারও দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ডাবলু শেখ ও তাঁর পরিবারের ভোটার তালিকায় থাকা তথ্য এবং অন্যান্য দেওয়ানি নথি স্বাধীনভাবে পুনরায় যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
ঘটনাটি নিয়ে মূল প্রশ্ন এখন—ওই চারজনের নাগরিকত্ব কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং তাঁদের সীমান্তের ওপারে পাঠানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে সংশ্লিষ্ট নথি ও সরকারি প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে আনার দাবি তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।