ছবি: সংগৃহীত
ভারতের তেল ও গ্যাস ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকারী অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ এবং পরিবেশের যত্নে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তবে এই নিয়োগ ঘিরে প্রশ্নও উঠেছে। অনন্ত আম্বানি গুজরাটে যে বিশাল বন্য প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্র ‘ভান্তারা’ পরিচালনা করেন, সেখানে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী কীভাবে আনা হয়েছে, তা নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে বন্য প্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর কেউ কেউ নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
অনন্ত আম্বানি ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ছেলে। মুকেশ আম্বানি মূলত তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে তাঁর সম্পদ গড়েছেন। তাঁর মালিকানাধীন রিলায়েন্স গোষ্ঠীর গুজরাটের জামনগরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার রয়েছে।
‘রহস্যজনক একটি পছন্দ’
ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও পরিবেশবিষয়ক লেখক রামচন্দ্র গুহ অনন্ত আম্বানিকে অধ্যাপক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা আরও অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁরা এমন স্বীকৃতির জন্য যোগ্য।
গুহ বলেন, তিনি অন্তত ৫০ জন, এমনকি ১০০ জনের নাম বলতে পারেন, যাঁরা ভারতের টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, জ্বালানি ও পানি সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিজ্ঞানী, দূষণ কমানোর বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বন রক্ষায় কাজ করা ব্যক্তিরা রয়েছেন।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় কার পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই করা হয়েছিল কি না। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তবে নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, অনন্ত আম্বানির বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশের যত্নে কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে এই অধ্যাপকের পদ দেওয়া হয়েছে।
ভান্তারায় দেড় লাখের বেশি প্রাণী
৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্ষদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গুজরাটে রিলায়েন্সের তেল শোধনাগারের কাছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর বা ৩ হাজার ৫০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত বন্য প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্র ভান্তারা।
সেখানে দেড় লাখের বেশি প্রাণী রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি সিংহ, ২৫০টি চিতাবাঘ এবং ৯০০টি কুমির রয়েছে।
২০২৪ সালে অনন্ত আম্বানির বিয়ের আগে ভান্তারায় জাঁকজমকপূর্ণ একাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এতে ভারতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তারকা ও রাজনীতিবিদেরা অংশ নেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ২০২৫ সালের মার্চে গুজরাটের জামনগরে ভান্তারার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্র উদ্বোধন করেন।
প্রাণী আমদানি নিয়ে যে প্রশ্ন
ভান্তারায় কিছু প্রাণী কীভাবে আনা হয়েছে, তা নিয়ে বন্য প্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী বিভিন্ন দেশ হয়ে ভান্তারায় পৌঁছানোর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জার্মান সংবাদপত্র ‘সুড্ডয়চে সাইটুং’-এর ২০২৫ সালের এক অনুসন্ধানে বলা হয়, ভান্তারায় আনা অনেক প্রাণী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ হয়ে এসেছে। এসব দেশে বন্য প্রাণী কেনাবেচার নেটওয়ার্কের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত বছরের আগস্টে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভান্তারা নিয়ে তদন্ত করে। ওই তদন্তে চিড়িয়াখানাটির পরিচালকদের কোনো অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়নি।
এরপর বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা সাইটিসও ভান্তারা নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভান্তারায় প্রাণী আনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিছু অনুমতিপত্র সম্ভবত জাল ছিল।
সাইটিস সতর্ক করে বলেছিল, বিপুলসংখ্যক প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, এর ফলে অসাবধানতাবশত অবৈধভাবে সংগ্রহ করা প্রাণীর চাহিদা তৈরি হতে পারে।
সংস্থাটি ভারতকে বিপন্ন বন্য প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করেছিল। তবে পরে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান সেই সুপারিশের বিরোধিতা করে। তাদের বক্তব্য ছিল, অবৈধভাবে প্রাণী আমদানির যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এরপর সাইটিস তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদেরও আপত্তি
অনন্ত আম্বানির নিয়োগ নিয়ে নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মীর মধ্যেও আপত্তি ছিল বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি। তাঁর ভাষ্য, পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয়টি উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের জলবায়ু, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক লায়লা মেহতাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরকারি অর্থায়ন কমছে। ফলে ধনকুবের ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণায় প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
মেহতার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হওয়া উচিত ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা; তাদের একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়।
ভান্তারার নতুন উদ্যোগ
গত এপ্রিল অনন্ত আম্বানি ‘ভান্তারা ইউনিভার্সিটি’ চালু করেন। এটিকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পশুচিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বের প্রথম বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
ভারতে বেআইনি বন্য প্রাণী বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধান করছেন ভুবন ম্যাঙ্গালোর। যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভান্তারা নিয়ে একটি অভিসন্দর্ভও লিখছেন। অনন্ত আম্বানির নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হওয়ার বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এটা কি কোনো রসিকতা?’
অন্যদিকে অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা বিভাগের সহপরিচালক লর্ন স্টকম্যান বলেন, জলবায়ু সংকটের সময়ে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত কমানো জরুরি। তাই সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আরও বেশি জবাবদিহি প্রত্যাশা করা উচিত।
অনন্ত আম্বানি ও ভান্তারার বক্তব্য
ভান্তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে আম্বানি পরিবার ও ভান্তারা এর আগে বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রাণীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও যত্ন নেওয়াই তাদের লক্ষ্য ও কাজ।
এদিকে গত আগস্টে ভান্তারা তাদের কার্যক্রমে ‘নতুন করে শুরু’র ঘোষণা দেয়। এর অংশ হিসেবে সাইটিসের সাবেক প্রধানকে কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সব ধরনের বন্য প্রাণী আমদানি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।