Photo Collected
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ভাষণের সময় সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল। বুধবার অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে এ ঘটনা ঘটে।
এর আগে মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রায় সব সদস্য সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু একজন প্রতিনিধি তাঁর আসনে ছিলেন।
বুধবারের ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। তবে সংঘাতের অবসানে কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগও তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে সবাই সুবিধা নেবে, অথচ ইরানকে ওই পথে জাহাজ চলাচল থেকে বঞ্চিত করা হবে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষায়, নৌপথটিতে শত্রুভাবাপন্ন নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি এবং সংঘাতের বিস্তার কোনোভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে না।
ট্রাম্পের হুমকির জবাব
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে কঠোর বক্তব্য দেন। তিনি তেহরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেন, যার মাধ্যমে ইরান আবার শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে চুক্তি না হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরান প্রসঙ্গ আসার পর দেশটির প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।
বুধবার নিজের ভাষণে পেজেশকিয়ান ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানকে সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অথচ তাঁর দাবি, ইরানই সন্ত্রাসবাদের শিকার।
‘বোমা নয়, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি প্রয়োজন’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও বক্তব্য দেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরানের প্রয়োজন পারমাণবিক বোমা নয়; বরং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি।
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ইরানের উন্নয়নের একটি অংশ। পারমাণবিক প্রযুক্তি কেবল কয়েকটি দেশের হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে—তেহরান তা গ্রহণযোগ্য মনে করে না।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প ইরানকে ওই মজুত ছেড়ে দেওয়ার দাবি করে আসছেন।
তবে ইরানের দাবি, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
খামেনি ও নিহত শিশুদের ছবি দেখালেন পেজেশকিয়ান
ভাষণের শুরুতে পেজেশকিয়ান ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি ছবি তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর প্রথম দিনে তেহরানে নিজের কম্পাউন্ডে খামেনি নিহত হন বলে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এরপর তিনি হামলায় নিহত শিশুদের ছবিও তুলে ধরেন। একটি স্কুলে বিমান হামলায় ওই শিশুরা নিহত হয়েছিল বলে জানান তিনি।
চলতি মাসের শুরুতে ইরানবিষয়ক জাতিসংঘের একটি তথ্য অনুসন্ধান মিশন জানিয়েছে, ইরানের একটি স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় দুটি সামরিক হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।
পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে এসব ঘটনাকে সামনে এনে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।