Photo Collected
দুই দশকের বেশি সময় মাইক্রোফোন হাতে সাংবাদিকতা করেছেন এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা। খবর পড়েছেন, মানুষের কথা তুলে ধরেছেন, দেশের নানা ঘটনা নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু ৫৬ বছর বয়সে এসে তাঁর নিজের জীবনই যেন হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় খবর। সাংবাদিকতার পরিচয় পেরিয়ে এবার তিনি উঠেছেন তোরো রাজ্যের সিংহাসনে। ২৯ সেপ্টেম্বর উগান্ডার ঐতিহাসিক তোরো রাজ্যের ১৩তম রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন তিনি। রাজা হিসেবে তাঁর নতুন নাম এডওয়ার্ড রুকিডি নিয়াবোঙ্গো প্রথম।
কিজানাঙ্গোমার রাজা হয়ে ওঠার পথ অবশ্য একেবারে সরল ছিল না। গত মাসে ৩৪ বছর বয়সে ক্যানসারে মারা যান তোরোর রাজা চতুর্থ ওয়ে ন্যিম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিডি। মাত্র তিন বছর বয়সে ১৯৯৫ সালে সিংহাসনে বসা ওয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৩১ বছর তোরো রাজ্যের রাজা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরই শুরু হয় উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া।
তোরোর রাজপরিবারের বাবিতো গোত্রের ২১ সদস্যের একটি কমিটি নতুন রাজা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে। কিজানাঙ্গোমার পাশাপাশি আরও কয়েকজনকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যের একটি অপেশাদার ফুটবল ক্লাবের অধিনায়ক ও গোলরক্ষক প্রিন্স জর্জ ডেসমন্ড কামুরাসি। তবে তিনি রাজা হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত কিজানাঙ্গোমার মাথাতেই ওঠে রাজমুকুট।
নতুন রাজাকে ঘিরে অবশ্য উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধও তৈরি হয়েছে। প্রয়াত রাজা ওয়ের মা রানি বেস্ট কেমিগিসা আকিকির দাবি, তাঁর ছেলে একটি শিশুপুত্র রেখে গেছেন এবং একটি উইলে ওই শিশুকে উত্তরসূরি করার কথা উল্লেখ ছিল। তবে শিশুটিকে কখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। বাবিতো গোত্রের উত্তরাধিকার কমিটি ওই দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং কিজানাঙ্গোমাকেই রাজা হিসেবে বেছে নেয়। রাজপরিবারের কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তোরোর রীতি ও ঐতিহ্য মেনেই নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
কিজানাঙ্গোমা ও প্রয়াত রাজা ওয়ে সম্পর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। তাঁরা চাচাতো ভাই এবং দুজনই তোরোর ১১তম রাজা রুকিডি তৃতীয়ের বংশধর। ফলে সাংবাদিকতা থেকে রাজসিংহাসনে তাঁর যাত্রা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে তোরোর রাজপরিবারের দীর্ঘ বংশপরম্পরা।
১৯৭০ সালে জন্ম নেওয়া কিজানাঙ্গোমা ফোর্ট পোর্টাল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের কিদুকুরু গ্রামে বেড়ে ওঠেন। ১৯৯৯ সালে উগান্ডার মেকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর শুরু করেন সাংবাদিকতা। দুই দশকের বেশি সময় সম্প্রচারমাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। উগান্ডা ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের পরিচিত মুখ হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী রুয়ান্ডাতেও কাজ করেছেন।
রাজা হওয়ার পর সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কথা জানিয়েছেন কিজানাঙ্গোমা। তাঁর ভাষ্য, ২১ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে গড়ে ওঠা যোগাযোগ ও সম্পর্ক তিনি মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে ব্যবহার করতে চান। নতুন রাজা ঐক্য, উন্নয়ন, সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তোরোর রাজা হলেও কিজানাঙ্গোমার হাতে উগান্ডার অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী রাজাদের মতো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। দেশটির ঐতিহ্যবাহী রাজ্যগুলো মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ভূমিকা রাখে। ১৯৬৭ সালে এসব রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হলেও ১৯৯০-এর দশকে সেগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।
কিজানাঙ্গোমার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনি। ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন আচার পালনের পর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা ঘোষণা করা হয়। রাজা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কিজানাঙ্গোমা জানিয়েছেন, তিনি একা কাজ করতে চান না; বরং সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়েই তোরোর ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করতে চান।