ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, শারুরাহ সামরিক ঘাঁটির অস্ত্রের গুদাম এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে অভিযানটি ঠিক কবে পরিচালিত হয়েছে, তা তিনি জানাননি।
বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হামলার দাবি করেন ইয়াহিয়া সারি। এর মধ্যেই সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের লড়াইও তীব্র হয়েছে। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় হাজারো মানুষ ঘর ছাড়ছেন।
চলতি সপ্তাহে সংঘাত বেড়ে যাওয়ার পর শনিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী লোহিত সাগরের বন্দরনগর মোখায় হুথিদের অবস্থানে হামলা চালানোর কথা জানায়। পরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ এলাকাতেও অভিযান চালানো হয়। ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর দাবি, সেখানে হুথিদের অবস্থান ও ব্যারাক লক্ষ্য করে তিন দফা বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে হুথিদের দাবি, গত ৪৮ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি আরবের ‘শত্রু বিমান’ ১২৯টি হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষও শনিবার রাতে হুথিদের একটি প্রক্ষেপণাস্ত্র সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পড়ার কথা জানিয়েছে। দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এতে দুজন আহত হয়েছেন। একটি মসজিদ, কয়েকটি ভবন ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের অভিযান চালায় হুথিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযানের শেষ পর্যায়ে তারা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বাকি অংশ এবং কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।
ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথিরা সম্প্রতি সৌদি আরবের লোহিত সাগরের বন্দরগুলোতে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে বলে খবর এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত সপ্তাহে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০১৪ সালে। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা কমে এলেও জুলাই থেকে আবারও তা তীব্র হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে যুদ্ধে যুক্ত হয় এবং এখনো এডেনভিত্তিক সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
নতুন লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সংঘাতের কারণে ৭৬ হাজার মানুষ ঘর ছেড়েছেন। মাত্র এক সপ্তাহে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা চার গুণ হয়েছে। মোখা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর অনেক বাসিন্দা এডেনে চলে গেছেন। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ জিবুতিতেও পালিয়ে গেছেন বলে দেশটির অর্থনীতি ও অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস মুসা দাওয়ালে জানিয়েছেন।
উভয় পক্ষের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ে ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি সৌদি আরবের কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, হুথিরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছে, তারা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। তবে ওয়াশিংটন পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৫ সালে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুথিদের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সাত সপ্তাহ ধরে গোষ্ঠীটির ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল। পরে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে হুথিরা ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যায়। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার পর লোহিত সাগরে জাহাজেও আবার হামলা শুরু করেছে তারা।
এদিকে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথি-সমর্থকেরা ২১০ বন্দির মুক্তি উদ্যাপন করেছেন। হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া এলাকায় আটক এসব বন্দীর কেউ কেউ আট বছর পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন।