ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবে মাদক পাচারের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মরদেহ দেশে ফেরত না পাঠানোর অভিযোগ তুলেছে ইথিওপিয়ার দুটি পরিবার। চলতি বছরের ২৩ জুন দক্ষিণ সৌদি আরবের আসির প্রদেশের খামিস মুশাইত কারাগারে পাঁচ ইথিওপীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী কিব্রম কিনফে আরেগাউই ও ২৬ বছর বয়সী সিগাবু গেব্রেমারিয়াম। দুজনের পরিবারই জানিয়েছে, প্রিয়জনের মরদেহ দেশে না পাওয়ায় ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করতেও পারেনি তারা।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিব্রমের বাবা কিনফে আরেগাউই ছেলের মৃত্যুর পর প্রতীকীভাবে শেষকৃত্যের আয়োজন করেছেন। তবে ছেলের মরদেহ দেশে ফেরত না আসায় সেই আনুষ্ঠানিকতায় তাঁর প্রকৃত সান্ত্বনা মিলছে না। তাঁর ভাষ্য, পরিবারের পক্ষ থেকে সব ধর্মীয় রীতি পালনের চেষ্টা করা হলেও এই ঘটনা সারাজীবনের দুঃখ হয়ে থাকবে।
ইথিওপীয় অর্থোডক্স খ্রিস্টান পরিবারগুলোর কাছে প্রিয়জনের মরদেহ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সমাহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিব্রমের পরিবার সেই সুযোগ পায়নি। তাঁর বাবা দাবি করেছেন, মাদক পাচারের অভিযোগে ছেলেকে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও কিব্রম পাননি বলে দাবি তাঁর বাবার।
কিব্রম ২০২০ সালে প্রথমবার বৈধ ভিসা ছাড়া বাবার সঙ্গে সৌদি আরবে যান। সে সময় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ১৫ মাস কারাগারে থাকার পর তাঁকে ইথিওপিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। পরে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি নৌকায় ওঠার পর পায়ে হেঁটে ইয়েমেন অতিক্রম করেন। ২০২৩ সালে সৌদি সীমান্ত পার হওয়ার সময় আবারও গ্রেপ্তার হন তিনি।
কিব্রমের বাবা জানান, প্রায় তিন মাস কারাগারে থাকার পর তাঁর ছেলেকে মাদক পাচারের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় তিন বছর কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের জুনে হঠাৎ তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন বাবা কিনফে।
একই দিন একই কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় সিগাবু গেব্রেমারিয়ামেরও। তিগ্রায় অঞ্চলের একটি গ্রামীণ জেলার আট ভাইবোনের মধ্যে সিগাবু ছিলেন সবার বড়। দারিদ্র্য ও গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে ১৮ বছর বয়সের পর বাড়ি ছাড়েন তিনি। পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন বলে জানান তাঁর বাবা হাগোস গেব্রেমেস্কেল।
মাদক পাচারের দায়ে সাড়ে তিন বছর কারাগারে থাকার পর সিগাবুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডের আগে গত ফেব্রুয়ারিতে পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল তাঁর। সে সময় শিগগির দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা জানিয়েছিলেন সিগাবু। তাঁর মা ছেলের জন্য পাত্রীও খুঁজছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ের আয়োজনের পরিবর্তে ছেলের প্রতীকী শেষকৃত্য করতে হয়েছে পরিবারকে।
সৌদিতে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে সিগাবুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর স্থানীয় একটি গির্জায় প্রতীকী শেষকৃত্য ও প্রার্থনার আয়োজন করে পরিবার। তাঁর মা ঐতিহ্যবাহী ৪০ দিনের শোক পালন করলেও ছেলের মরদেহ দেশে ফেরত না আসায় শোক আরও ভারী হয়ে উঠেছে বলে জানান।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উদ্বেগ জানিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুলাই পর্যন্ত এক বছরে সৌদি আরবে ১১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যার দিক থেকে চীন ও ইরানের পর সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের গবেষক দুয়া ধাইনি বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়া শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর মাধ্যমে পরিবারের ওপরও এক ধরনের শাস্তি নেমে আসে। জাতিসংঘের ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক নাজিলা ঘানেয়াও সৌদি আরবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগকে ‘নির্যাতন ও নিপীড়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অপরাধী চক্রগুলো অনেক সময় অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করে।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাদশাহ সালমান সিংহাসনে বসার পর থেকে সৌদি আরবে দুই হাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা এক বছরে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সর্বোচ্চ সংখ্যা।
সৌদি আইনে দূতাবাসের খরচে মৃতদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ থাকার কথা বলা হলেও মানবাধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, বাস্তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অভিবাসীদের মরদেহ পরিবারকে ফেরত দেওয়ার ঘটনা তাঁরা নথিবদ্ধ করতে পারেননি। অতীতে তুরস্ক ও জর্ডানের কয়েকটি পরিবার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বজনদের মরদেহ দেশে ফেরত নেওয়ার দাবি জানালেও সফল হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিবিসি এ বিষয়ে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লন্ডনে দেশটির দূতাবাসের মন্তব্য জানতে চেয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। সৌদিতে বর্তমানে কতজন বন্দী মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন, সে তথ্যও সরকার প্রকাশ করে না। মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, এই সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা এক সৌদি কারাবন্দী দাবি করেছেন, চলতি বছর তিনি ১৫ জন সহবন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখেছেন। পরিচয় প্রকাশ না করা ওই বন্দী বলেন, প্রতিবার কারাগারের রক্ষীরা দরজা খুললে বন্দীরা আতঙ্কে ভাবেন, এবার কার পালা। শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও অন্তত মরদেহ যেন পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়—এটাই এখন তাঁর শেষ ইচ্ছা।