Photo Collected
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত মেনে নিলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে প্রস্তুত ইরান। তবে এর বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দেবে না তেহরান। শুক্রবার রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরানের প্রস্তাবের আওতায় নৌ অবরোধ প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রণালিটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।
সাত দিনের প্রস্তাব ইরানের
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এর আগে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা যেতে পারে। তাঁর প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিতে, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় করতে এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধের কথাও রয়েছে ওই প্রস্তাবে। আরাগচি শুক্রবার জাতিসংঘে সাংবাদিকদের বলেন, প্রস্তাবটি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
ইরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেওয়ার পর ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং সপ্তম দিনে পারমাণবিক কর্মসূচিসহ পারস্পরিক সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার কথা রয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় নয়
তবে হরমুজ প্রণালি খোলার বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছে তেহরান। রয়টার্সকে দেওয়া ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর মতো বিষয়ে ইরান কোনো ছাড় দেবে না।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ পশ্চিমা দেশগুলো তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বিশেষ করে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর আপত্তি রয়েছে।
ইরানের ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত অন্যান্য শর্ত মেনে নিলেও নিজেদের পারমাণবিক অধিকার নিয়ে তেহরানের অবস্থানের পরিবর্তন হবে না।
দর-কষাকষির কেন্দ্রে হরমুজ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরান চাইছে তাদের ওপর আরোপিত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমানো হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি হওয়ায় এর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধাবস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
চুক্তির আশা পেজেশকিয়ানের
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করেছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার বার্তা দেওয়া হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের মৌলিক অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
এর আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সংঘাত বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলমান রয়েছে।
ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া এখন নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শর্তগুলো নিয়ে সমঝোতা কতটা হয় তার ওপর। তবে তেহরানের সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী, অর্থনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে ছাড় দেওয়ার আলোচনা হলেও পারমাণবিক কর্মসূচিতে নিজেদের ঘোষিত অধিকার থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে তারা প্রস্তুত নয়।